রাতের ‘গ্রীণভ্যালি পার্ক’:কিছু গহীন অনুভূতি


গোলাম সারওয়ার :
দিনে হাজারো আবালবৃদ্ধরমণীর কলরবে থাকে মুখরিত ।সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই সেখানে নেমে আসে নিরবতা,একরাশ নিস্তব্ধতা। থাকেনা শিশুদের প্রাণোচ্ছ্বল ছুটাছুটির শব্দ,শোনা যায়না নব দম্পতির আকুলতাভরা হাসির শব্দ,শোনা যায়না প্রেমিক- প্রেমিকাদের আবেগঘন ফিসফিসানি,শোনা যায়না প্রবীণদের ফেলে আসা রঙিন দিনগুলোর হাহাকারের দীর্ঘশ্বাস । শুধুই বিরাজ করে একরাশ শূন্যতা।আর হাজারো পদশব্দের প্রতিধ্বনি। যে প্রতিধ্বনি শুনতে পেয়েছিলেন ভূপেন হাজারিকা তার গানের মধ্য দিয়ে “প্রতিধ্বনি শুনি আমি প্রতিধ্বনি শুনি/নিশীথ রাত্রির প্রতিধ্বনি শুনি/নতুন দিনের যেন প্রতিধ্বনি শুনি”।


গতকাল শুক্রবার গেছিলাম নাটোর লালপুরের বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় “গ্রীণভ্যালি পার্কে”। অপেক্ষা করছিলাম পার্কের রাতের রূপ দেখার জন্য।কান পেতে নিশুতি পার্কের আত্মকথা শোনবার জন্য।পার্কের মধ্যে রাতে আমরা চার সাংবাদিক। আমি এবং লালপুরের সাংবাদিক রায়হান ভাই,সালাহউদ্দিন ভাই ও বাগাতিপাড়ার মজিদ ভাই।রায়হান ভাই এই পার্কেরই ব্যবস্থাপনার একজন কর্মকর্তা। তারই বদৌলতে এই সুযোগটা পাওয়া।সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য পার্ক খোলা থাকে।অবশেষে সন্ধ্যা পার হয়,ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে আসে।অধিকাংশ বাতিগুলো বন্ধ হয়ে যায়।দর্শনার্থীদের কোলাহল অনেক আগেই থেমে গেছে।পার্কে বিরাজ করছে পিনপতন নিরবতা।আমিও গভীর সান্নিধ্যে যেতে চাই। অন্তরাত্মা দিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করি।দূর থেকে ভেসে আসে একজন নারীর অস্ফুট আর্তনাদ।সে বলছে,”আমি মা,আমার এই বুকের উপর আমার সন্তানেরা যখন দৌড়াদৌড়ি, ছুটাছুটি করে আনন্দ করে,তখন আমি তৃপ্তি পাই।সবাই এখানে আনন্দ করতে আসে,একটু ভাল লাগার পরশ পেতে আসে।কোলাহল থেকে,একঘেয়েমি জীবন থেকে একটু পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য এখানে ছুটে আসে।স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা এখানে এসে কত আনন্দ পায়।সরকারি বড় বড় কর্মকর্তারা, বড় বড় রাজনীতিবিদরা এখানে আসে একটু রিলাক্সের জন্য।দেখি,সবার সাথে সবার কত মিল মহব্বত।আমি সবার আনন্দ দেখে,মিল মহব্বত দেখে আনন্দ পাই,ভাল লাগে।কিন্তু রাত বাড়ার সাথে সাথে মনের মধ্যে নিরানন্দে ভরে ওঠে।হতাশ হই।এখানে সবার মধ্যে যে মিল মহব্বত দেখি, বাস্তবে কী তাই।এখানে বড় বড় কর্মকর্তা,রাজনীতিবিদরা যারা আসে,তারাই দুর্নীতি করে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করছে।রাজনীতির নামে জনগণকে ধোকা দিচ্ছে।এখান থেকে বের হয়ে গিয়েই ছাত্ররা পরস্পর পরস্পরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে।এখান থেকে আনন্দ করে ফিরে গিয়েই স্বামী তার স্ত্রীকে হত্যা করছে।প্রেমিক প্রেমিকার সম্ভ্রম হানি করছে। আমার বুকের উপর এসে তাদের যে মিল মহব্বত দেখি, তা যদি রাজনীতিবিদদের মধ্যে থাকতো,পরিবারের সদস্যদের মধ্যে থাকতো,তাহলে আজ দেশটা “গ্রীণভ্যালি পার্কের” মত সুন্দর আনন্দমুখর হয়ে উঠতো।সম্বিত ফিরে পেয়ে চার প্রাণী সমস্বরে বলে উঠি “আমরা রাতের অন্ধকারের মত নয়, এই দেশটাকে আমরা দিনের গ্রীণভ্যালির মত দেখতে চাই।আমাদের কলম হয়ে উঠুক ” গ্রীণভ্যালি”।

শর্টলিংকঃ