এসিল্যান্ড লিখিত অভিযোগ দিতে বললেন সাংবাদিককে!

বাগাতিপাড়ায় আবাদী জমিতে পুকুর খননের অভিযোগ এমপি’র অ্যাম্বাসেডরের বিরুদ্ধে

আনোয়ার হোসেন অপু, স্টাফ রিপোর্টার:
নাটোরের বাগাতিপাড়ায় আশ্রয়ন প্রকল্পের দোহাই দিয়ে আবাদী জমিতে চলছে পুকুর খনন। চলছে লাখ লাখ টাকার মাটি বিক্রি উৎসব!! অফিস ম্যানেজ ফি হিসেবে জমির মালিককে গুনতে হয়েছে ৪০ হাজার টাকা! এমন ঘটনা দীর্ঘদিন থেকে চললেও প্রশাসনের ভূমিকা অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ।

উপজেলার একাধিক মাঠে ফসলি জমিতে পুকুর খনন চলছে। ঐ পুকুরগুলো খননের সরকারিভাবে অনুমোদন আছে কিনা? এমন প্রশ্নে বাগাতিপাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিশাত আনজুম অনন্যা বলেন, উপজেলার কোথাও সরকারিভাবে পুকুর খননের অনুমতি নেই। আপনি দেখে থাকলে কারা কোথায় পুকুর খনন করছে এ সংক্রান্ত তথ্য অভিযোগ আকারে লিখে ইউএনও স্যারের কাছে জমা দেন। তাহলে বিষয়টি দেখা হবে।

এম্বাসেডর তানসেন আহমেদ হিমেল

আর জিনি এই টাকা গ্রহণ করেছেন তিনি এমপির অ্যাম্বাসেডরের তানসেন আহমেদ হিমেল। নাটোর-১( লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনের এমপি শহিদুল ইসলাম বকুলের অ্যাম্বাসেডর হিসেবে তিনি এমপির সফরসূচী পাঠান বিভিন্ন দপ্তরে। থাকেন এমপির সফরসঙ্গী হিসেবে। তাই সবাই তাকে এমপির লোক বলেই জানেন। আর এই পরিচয়ের সুযোগ নেন সেই অ্যাম্বাসেডর সহ সুবিধাভোগীরা। এরই অংশ হিসেবে নিজ পদ ও পরিচয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন বাগাতিপাড়া উপজেলায় আবাদী জমিতে পুকুর খনন কারীদের আশ্রয়দাতা যদিও তা সরকারীভাবে নিষিদ্ধ। তবে তার কাজটা অনেকটা শাখের কড়াতের মতো যা যেতেও কাটে আবার আসতেও কাটে। কেননা আবাদী জমিতে পুকুর খনন করিয়ে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন অফিস ম্যানেজের জন্য যেমন জমির মালিকের কাছ থেকে টাকা নেন আবার ওই জমির মাটি বিক্রি করে আয় করেন লাখ লাখ টাকা। বর্তমানে এমনই এক ঘটনা চলছে বাগাতিপাড়া উপজেলার জামনগর ইউনিয়নের চকবাঁশবাড়িয়া এলাকায়।


তার বিরুদ্ধে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় ধরে তিনি চকবাঁশবাড়িয়া এলাকার মজিবর রহমানের আবাদী জমিতে পুকুর খনন করিয়ে দিয়ে ওই মাটি আশ্রয়ণ প্রকল্পে দেওয়ার নামে অবাধে বিক্রি করছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, চকবাঁশবাড়িয়া এলাকায় আবাদী জমিতে একটি ব্যানার দেয়া রয়েছে। সেখানে লিখা রয়েছে মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে ভূমিহীন ও আশ্রয়হীনদের আশ্রয়ণ প্রকল্পে মাটি ভরাট ও পুকুর সংস্কারের প্রয়োজনে মাটি খননের কাজ চলছে” জামালপুর (বাজিতপুর মৌজা) জামনগর ইউনিয়ন বাগাতিপাড়া, নাটোর। ব্যানারের পাশেই আবাদী জমিতে চলছে ভেকু দিয়ে পুকুর খনন। আর মাটিগুলো চলে যাচ্ছে ট্রাক্টরে। ট্রাক্টর চালকরা জানালেন, বিভিন্ন ক্রেতাদের কাছে তারা মাটিগুলো পৌছে দিচ্ছেন। স্থানীয়রা জানালেন,ওই জমির মালিক মজিবর হলেও মাটি কাটাচ্ছেন তানসেন।
এব্যাপারে জানতে চাইলে জমির মালিক মজিবর রহমান জানান, ওই জায়গা তাদের চার ভাইয়ের নামে হলেও তার রয়েছে পৌনে তিন বিঘা। ওই জায়গায় আগে থোকেই পুকুর ছিল। এবার তিনিও তার জমিতে পুকুর করে আগের পুকুরটির সাথে এক করছেন। এভাবে পুরো জমিতেই তারা পুকুর করে মাছ চাষ করবেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবী করেন, জমির মাটি কেটে পুকুর করার জন্য তিনি তার শ্যালক লিটন ও স্থানীয় জামরুলকে দায়িত্ব দেন। পরে তারাসহ তিনি তার অপর শ্যালক হিমেলকে বললে অফিস ম্যানেজের জন্য হিমেল তার কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকা নেয়। এরপর ইউএনওর পরামর্শে তার জমি ধানী থেকে পুকুর দেখিয়ে খারিজ করার পর তার সই নিয়ে পুকুর সংস্কারের অনুমতি চেয়ে ইউএনওর কাছে আবেদন করলে ভিজিট শেষে ইউএনও অনুমতি দেন। এরপর ওই মাটির কিছু অংশ আশ্রয়ন প্রকল্পে দিয়ে বাঁকিগুলো হিমেল বিক্রি করছে।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে উপজেলার নূরপুর মালঞ্চি এলাকার বাসিন্দা খাইরুল জানান, তিনি হিমেলের কাছ থেকে একগাড়ি মাটি ১১ শ টাকায় কিনেছেন। তার মতো স্থানীয় অনেকেই ওই মাটি কিনছেন দাবী করে জানান, প্রতিদিনই ওই এলাকায় অনেকেই মাটি কিনছেন।

এব্যাপারে জানতে চাইলে হিমেল জানান, অনুমতি নেয়া আছে। আপনি আমার কাছে এসে অনুমোদনের কপি দেখে যাবেন। আর আমি সব সময় ৫০ থেকে ৬০টা সাংবাদিক নিয়ে থাকি। তারা জেলার বড়বড় সাংবাদিক। আপনি কোন পত্রিকার-চ্যানেলের সাংবাদি, আপনার পরিচয়পত্র নিয়ে আমাকে দেখাবেন। তারপরে আপনাকে আমার পুকুর খননের অনুমতির কাগজপত্র দেখাবো। আপনি আমাকে চেনেননা, আমি এমপির সাথে থাকি। দিঘিরপাড়ে এমপি কালকে আসবে আপনাকে জবাবদিহি করতে হবে এই বিষয় নিয়ে। আপনি কতবড় সাংবাদিক আমার দেখতে খুব ইচ্ছা করছে। মনে হচ্ছে এক্ষনি আপনার কাছে যাই।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে এমপি শহিদুল ইসলাম বকুল বলেন, তিনি আবাদী জমিতে পুকুর খননের বিপক্ষে। যদি হিমেল এধরণের কাজ করে তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবশ্যই তদন্ত সাপেক্ষে ব্যাবস্থা নেবেন। এব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করতে পরামর্শ দেন তিনি।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে ইউএনও প্রিয়াঙ্কা দেবী পাল জানান, প্রায় ১৫-২০ দিন আগে চকগোয়াস-বেগুনিয়া আশ্রয়ন প্রকল্পে মাটি নেয়া শেষ হয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তেল খরচের জন্য সামান্য মাটি বিক্রির কথা তারা বলেছিল কিন্তু আইনত তারা ওই মাটি কারো কাছেই বিক্রি করতে পারবে না। মাটি বিক্রি বন্ধে তিনি দ্রুত পদক্ষেপ নেবেন এমন আশ্বস্ত করেন ইউএনও।

এ ঘটনায় নাটোর জেলা প্রশাসক মোঃ শাহরিয়াজ বলেন, আমি শুনলাম বিষয়টি দেখবো।

শর্টলিংকঃ